গায়েব টাকার ছায়া মিলনের নতুন মাদ্রাসায়!

 

পর্ব ০৩

মুফতি মিলনের কাণ্ড

টাকার উৎস অজানা, তবুও দাঁড়িয়ে নতুন মাদ্রাসা

গায়েব টাকার ছায়া মিলনের নতুন মাদ্রাসায়!

মো. আব্দুল বারি খান: নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুলিহার কাচারী পাড়া এলাকার হামিয়াতুস সুন্নাহ আদর্শ বালিকা কওমি নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসাকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। আবাসিক এই মহিলা মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের অর্থের উৎস ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠেছে একাধিক অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিলনের ব্যক্তিমালিকানাধীন এই মাদ্রাসাটির নির্মাণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত অর্থের উৎস স্পষ্ট নয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো গড়ে ওঠায় এলাকাবাসীর মধ্যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এই অর্থ কোথা থেকে এলো? কেউ কেউ বলছে; টাকার উৎস অজানা, তবুও দাঁড়িয়ে নতুন মাদ্রাসা! গায়েব টাকার ছায়া পড়েছে মিলনের নতুন মাদ্রাসায়!

অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসাটিতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কার্যকর কোনো পরিচালনা কমিটি নেই। নামমাত্র একটি “ছায়া কমিটি” দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দ এবং বিদেশি দাতা সংস্থা—বিশেষ করে সৌদি আরবভিত্তিক  সাহায্য সংস্থার অর্থ গ্রহণ ও এর যথাযথ ব্যবহার নিয়েও স্পষ্টতার অভাব রয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলন একটি হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে এলাকার মানুষের সহযোগিতায় তার পড়ালেখা সম্পন্ন হয় বলে জানান এলাকাবাসী। তার বাবা দীর্ঘদিন ভ্যানচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং বিভিন্ন সময় অন্যের বাড়িতে কাজও করেছেন। পারিবারিক দুশ্চিন্তার কারণে একপর্যায়ে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন বলেও জানা যায়; পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে আবার ভ্যান চালিয়েই সংসার চালাতে থাকেন।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে মাহমুদুল হাসান নিজ এলাকায় জমি ক্রয় করে একটি আবাসিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। জমি কেনা থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তাদের ধারণা। তবে তার দৃশ্যমান বা সুস্পষ্ট কোনো আয়ের উৎস না থাকায় এত বড় অঙ্কের অর্থের উৎস নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কিছু মানুষের মধ্যে এ নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে যে, অর্থের উৎস স্বচ্ছ নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে যথাযথ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাদ্রাসা। যেখানে মানুষের দান-সদকা, যাকাত ও এতিমদের সহায়তার অর্থ দিয়ে গড়ে ওঠে শিক্ষার আলো। কিন্তু সেই পবিত্র আমানতের অর্থ নিয়েই যদি ওঠে আত্মসাতের অভিযোগ—তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

একটি মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে স্থানীয় এলাকা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে মানুষের আস্থা দীর্ঘদিনের। সেই আস্থার জায়গা থেকেই মানুষ দান-সদকা ও যাকাত প্রদান করে।

অভিযোগ উঠেছে, মিলন নামের এক ব্যক্তি নওগাঁ সদরের পয়না আদর্শ মহিলা ক্বওমী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ৩ বছর যাবৎ  চাকুরি করা কালীন সময়ে আর্থিক কার্যক্রমে যুক্ত থেকে ধাপে ধাপে অর্থ আত্মসাৎ করেন। প্রথমদিকে বিষয়টি কারও নজরে না এলেও পরবর্তীতে হিসাবের অসঙ্গতি ধরা পড়লে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

এদিকে, সম্প্রতি ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বিষয়। অভিযোগ রয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থ ব্যবহার করেই মিলন তার নিজ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত মাদ্রাসা নির্মাণ করেছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দায়িত্বশীল পদে থেকে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকৃত সত্য উদঘাটন হলে যেমন অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে, তেমনি নির্দোষ কেউ থাকলে তার অবস্থানও পরিষ্কার হবে।

এদিকে মিলনের নিজ এলাকায় হঠাৎ করেই একটি নতুন মাদ্রাসা নির্মাণ শুরু হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় অঙ্কের অর্থের উৎস কোথায়? সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর মিললেই পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।

অন্য মাদ্রাসায় চাকুরি করা কালীন সময়ে মিলনের নিজ এলাকায় দ্রুতগতিতে একটি নতুন মাদ্রাসা নির্মাণ সম্পন্ন হয়। স্থানীয়দের দাবি, তার আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে এই নির্মাণ ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। ফলে গায়েব হওয়া অর্থের সঙ্গে নতুন মাদ্রাসা নির্মাণের যোগসূত্র রয়েছে কিনা—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা আরো দাবি করেন, তার আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে এই নির্মাণ ব্যয়ের মিল পাওয়া যায় না। ফলে পুরোনো মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আরও জোরালো হয়।

একটি অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁ সদরের বলিহার ইউনিয়নের স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব আজিজার রহমান মাষ্টার স্থানীয়দের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১৬ সালে পয়না আদর্শ মহিলা ক্বওমী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সুধীজনদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃত করা হয়।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে আজিজার রহমান মাষ্টার বিশ্বাসের ভিত্তিতে মুফতি মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলনকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল একটি পদে নিয়োগ দেন এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করেন বলে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাতার জমানো অর্থের বড় একটি অংশ গায়েব করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। মুফতি মিলন ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাষ্টার আজিজার রহমানের প্রায় ২৩ লাখ টাকা  বিভিন্ন সময়ে খরচ, পরবর্তী হিসাব বা চলমান কাজ ইত্যাদি দেখিয়ে ধাপে ধাপে প্রতারণার মাধ্যমে আত্নসাৎ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে সেই অর্থ দিয়েই নিজ এলাকায় একটি নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার আর্থিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন মুফতি মিলন। শুরুতে তার ওপর আস্থা ছিল কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক হিসাব-নিকাশে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। কিছু অর্থের সঠিক ব্যাখ্যা না মেলায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ গায়েব হতে থাকে। কিন্তু বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে আসে তখনই, যখন মিলনের নিজ এলাকায় নতুন একটি মাদ্রাসা নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হতে দেখা যায়।

পয়না আদর্শ মহিলা ক্বওমী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব আজিজার রহমানের ছেলে এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে বিটিবি নিউজকে জানান, স্থানীয় পার্শ্ববর্তী এলাকার জামাই হিসেবে বিশ্বাস করে মুফতি মাহমুদুল হাসান মিলনকে আমাদের মাদ্রাসার মহতামিম হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যাবতীয় দায়িত্ব দেয়া হয়। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাষ্টার আজিজার রহমান ২০২৫ সালের ২৫ আগষ্ট মৃত্যুবরণ করেন। তার ছেলে বলেন, বাবার ইচ্ছায় তিনি নিজে ৩৩ শতক জমি ক্রয় করে সেখানে ১০ কাঠার উপর মাদ্রাসা এবং বাকি অংশে পুকুর ও ফাঁকা জায়গা রয়েছে। প্রথম অবস্থায় ৫ম তলা ফাউণ্ডেশনে একটি বিল্ডিং নির্মাণ কাজ শুরু করে মুফতি মিলনের হাত ধরেই। মহতামিম হিসেবে এবং স্থানীয় এলাকার জামায়ই, আলেম, মুফতি হিসেবে বিশ্বাস ও সৎ মনে করে ওই বিল্ডিং এর যাবতীয় দায়িত্ব মিলনকে দেয়া হয়েছিল।

মুফতি মিলন ১ম তলা পর্যন্ত কম্প্লিট করে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ দেখান। সেই ঋণ প্রায় ২ বছরে পরিশোধ করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। মাদ্রাসা চলা অবস্থায় মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলন চাল, তেল, মাছ, খড়ির দোকানসহ বিভিন্ন জায়গায় ঋণের পরিমাণ অব্যহত রাখে। 

কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার সুধীজনের দান, অনুদান ও সহযোগিতায় মাদ্রাসাটি পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত সেখানে অধ্যয়নরত থাকায় স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি থাকার কথা নয় বলে তারা মনে করেন। 

তবুও মিলন কৌশলে বারবার ঋণের বোঝা বাড়াতেই থাকেন। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে পরকালের মুক্তির আশায় সহজ সরল মনে তার পেনশনের টাকাসহ তার জীবনে জমানো প্রায় ৪০ লাখ টাকার একটি বড় অংশ  এ প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করেছেন মুফতি মিলনের মাধ্যমে। এখান থেকে প্রায় ২২/২৩ লাখ টাকা মিলন কৌশলে কায়দা করে আত্নসাৎ/চুরি করেছে বলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব আজিজার রহমান মাষ্টারের বরাত দিয়ে তার সন্তান বিটিবি নিউজকে জানান। তিনি আরো বলেন, তার বাবার জমানো এই টাকা থেকে অল্প কিছু টাকা ব্যক্তিগত এবং তারা স্বামী-স্ত্রী হজ্ব (বাবা-মা) করেছেন। বাকি টাকা তার ৪ সন্তানের মধ্যে কেউ দেখতে পায়নি। মাষ্টার আজিজার সব সময় তার ছেলেদের বলতো বাবা তোমরা আমার উপার্জিত এ টাকা নিও না। আমি জমানো এ টাকা দিয়ে ধর্মীয় কাজে লাগাবো। এর প্রতি তোমরা লোভ করোনা বলেও তার ওই সন্তান বিটিবি নিউজকে জানান। 

তিনি আরো বলেন, এক পর্যায়ে তার বাবার টাকা সব শেষ হয়ে গেলো। চালের দোকানদার টাকা চায়, তেলের দোকানদার, মাছ ব্যবসায়ী, খড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ব্যক্তি টাকা চাইতে আসলে হুজুর মিলন প্রতিষ্ঠানের সভাপতির নিকট তাদেরকে পাঠান। সভাপতি মাষ্টার আজিজার তখন আক্ষেপের সাথে বলতেন মাদ্রাসায় জমি দিয়ে মাদ্রাসা নির্মাণ করে দিয়েই কি ভুল করেছি নাকি! তিনি তখন তাদেরকে বলতেন, তোমরা ২জন পুরুষ শিক্ষক ও ৬ জন মহিলা শিক্ষকা দিয়ে মাদ্রাসা চালাচ্ছো। আমি তো মাসিক কিংবা বাৎসরিক কোন টাকা নেই না। কিংবা মাদ্রাসায় বসে এককাপ চা পান করি একথা কি তোমরা কেউ বলতে পারবে এমন কথাও মিলনকে আক্ষেপের সাথে বলেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। এগুলো যদি না করে থাকি তাহলে তুমি (মিলন) তাদেরকে আমার কাছে পাঠাও কেন? এমন অনেক প্রশ্নও ছিল প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

সভাপতির ছেলে বাবার বরাত দিয়ে জানান, এতো এতো বাকী ও ঋণের আড়ালে মাহমুদুল হাসান মিলন গোপনে তার নিজ এলাকায় মাদ্রাসা নির্মাণ করার নামে জমি ক্রয় করেছে। সভাপতি আজিজারকে তিনি (মিলন) বলেন, চাচা আমার বাড়ির কাছে একটু জমি ক্রয় করেছি। একটি মাদ্রসা করবো। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি ওই মাদ্রাসার কাজ শুরু করবো? সে তার উদ্যোগের কথা শুনে সভাপতি আজিজার মাষ্টার তাকে বলে এটা তো খুব ভালো উদ্দেশ্যে। কোন সমস্যা নেই। তুমি মাদ্রাসা শুরু করো। এমন উক্তিতে চতুর মিলন আজিজার মাষ্টারকে বলেন, চাচা তাহলে আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে এবং আপনাকেই উদ্বোধন করতে দিতে হবে। সভাপতি তার উক্তিতে বলেন, ভালো কাজে তুমি আমকে পাবে। কৌশলি ও চতুর মিলনের যেই কথা সেই কাজ। মিলন আজিজার মাষ্টারকে নিয়ে তার নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠান করতে নিয়ে আসলে আজিজার মাষ্টার তাকে জিজ্ঞাসা করেন, বাবা তুমি মাদ্রাসা তো তুমি নির্মাণ করছে এটা কার নামে করছো। এমন প্রশ্নে মিলন তাকে বলেন এটি আমার ব্যক্তিগত মাদ্রাসা। তখন আজিজার মাষ্টার মিলনকে বলে, তাহলে আমি এখানে থাকবো না। তোমার ব্যক্তিগত মাদ্রসায় আমি নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন মাষ্টার আজিজার রহমান। তুমি কাকে দিয়ে উদ্বোধন করে নিবে তাকে দিয়ে করে নিও। আমি তোমার সাথে নেই। আজিজার মাষ্টার তখন আরো বলেন, তুমি যদি মাদ্রাসাটি ওয়াকফ বা জনকল্যাণমূলকভাবে পরিচালিত করো তাহলে আমি এখানে আসবো এবং সহযোগিতা করব। তখনও মুফতি মিলন মাষ্টার আজিজার রহমানের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।  এমন পরিস্থিতিতে তৈরি হলো মিলন ও সভাপতির মধ্যে মতপার্থক্য ও দূরত্ব। আজিজার মাষ্টারের ছেলে তার বাবার বরাত দিয়ে একথাগুলো বলেন। 

একদিন মিলনের বাড়ির নিকটের কুলিহার বাজারের একজন খড়ির ব্যবসায়ী এ রিপোর্ট বর্ণনাকারীর নিকট বকেয়ার ৫৫ হাজার টাকার বিল দেখিয়ে টাকা চায়। এমন বর্ণনা দিতে দিতে কুলিহার মোড়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে বর্ণনাকারী বিটিবি নিউজকে বলেন, তারা মাহমুদুল হাসান মিলনের জন্ম থেকে বর্তমান সময়ে বেড়ে উঠা নানা অনিয়ম, কুকৃর্তি, ভন্ডামীসহ বহু তথ্য দিতে পারবে। বর্ণনাকারী আরো বলেন, তার বাবার জের ধরে এবং খড়ি ব্যবসায়ীর ঐ বকেয়ার টাকার জেরে মুফতি মিলনের সঙ্গে বাকবিতন্ডা শুরু। ওই দিন সভাপতির ছেলে মিলনকে বলে; তুমি একজন মুফতি মানুষ, আলেম মানুষ। চাউল, খড়ি, তেল, মাছ ব্যবসায়ী কেন আমাদের কাছে টাকা চাইতে আসবে বলে মিলনকে নানা ধরনের বকাঝকা করেন। তিনি মিলনকে বলেন তুমি মাদ্রাসা চালাচ্ছো তুমিই সব কিছু দেখবে। তুমি সভাপতির বাড়িতে এসকল পাওনাদারদের কেন পাঠাও এমন কথা বলায় সেই দিন মিলন মাদ্রাসার চাবি তাদের কাছে ফেলে দিয়ে চলে যান। 

তাঁর ছেলে আরো বলেন, বছর শেষে মাদ্রাসা যতধরনের বকেয়া থাকে তা পরিশোধ করা হয়। একজন খড়ি ব্যবসায়ীর কত টাকাই থাকে যেখানে সে ৫৫ হাজার টাকা বাকি রেখেছে এমন কথা বলেও তিনি আক্ষেপ করেন। অথচ প্রতিমাসেই কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে যাবতীয় টাকা নেয়। কিন্তু মিলন কৌশলে ওই সকল ব্যবসায়ীর নিকট নানা লেনদেনে কায়দা করে বকেয়া/জের রাখে। বকেয়া যখন বেশি হয় তখন সভাপতির নিকট তাদের কৌশলে পাঠিয়ে দেন। এমতবস্থায় কমিটির লোকজন বিষয়টি জানতে পারলে তাকে বহিষ্কার না করে তাকে রেখেই অন্য আরো একজনকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেন। 

মিলন প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে মাহমুদুল হাসান মিলনকে ডেকে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় বিষয়ে হিসেব চাইলে সে আর প্রতিষ্ঠানে আসেনা। একপর্যায়ে তার শ্বশুরের মাধ্যমে তাকে মাদ্রাসায় আনলে সে কোন প্রকার হিসেবে দিতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানের বহুটাকা আত্নসাৎ ও চুরি করার কারণে তাকে মৌখিকভাবে চোর সাব্যস্ত করে সেখান থেকে বিদায় করা হয়। এতো কিছুর পরও চতুর ও নিরলর্জ মিলন কায়দা করে মৌলভীভক্ত সহজ সরল ব্যক্তি আজিজার রহমানকে নানাভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজ এলাকায় দেয়া মাদ্রাসার ছাদ ঢালাইয়ের দিনে নিয়ে যান। মিলনের নতুন মাদ্রাসার ছাদ ঢালাইয়ের শেষে বাড়ি এসে আজিজার মাষ্টার তার ছেলেদের বিষয়টি বলেন। ছেলে তখন তার বাবা আজিজার মাষ্টারকে বলেন, বাবা ঐ মাদ্রাসা ওয়াকফ না করে দিলে তুমি নাকি আর যাবে না বলেছিলে। প্রতিউত্তরে ছেলে আজিজার রহমান বলেন, বাবা ওই মুফতি মিলন চিটার। ওই মাদ্রাসা নাকি তার স্ত্রীর নামে দিয়েছে বলে মিথ্যা কথা বলেছে। তাকে বলেছে তার স্ত্রী-ই নাকি মাদ্রাসা চালাবে। এমন অনেক কথাই পয়না আদর্শ মহিলা ক্বওমী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৃত আলহাজ্ব আজিজার রহমান মাষ্টার তার ছেলের নিকট বর্ণনা করেছেন বলে তার ছেলে বিটিবি নিউজকে জানান।

তিনি আরো জানান, আমার বাবা একজন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক ও সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষ। ভন্ড, চতুর ও বিশ্বাঘাতক মুফতি মিলন আমার বাবাকে নানাভাবে কায়দা কৌশল করে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার বাবার জমানো প্রায় ২২/২৩ লাখ টাকা আত্নসাৎ ও চুরি করে। আমাদের মাদ্রাসায় চাকুরি করা অবস্থায় সেই টাকা দিয়ে দামী মটরসাইকেল ক্রয় করে এবং নিজ এলাকায় জমি, ইট, সিমেন্টসহ নানা সামগ্রি ক্রয় করে ব্যক্তিগতভাবে নতুন একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করে। তিনি আরো বলেন, সে যখন আমাদের মাদ্রাসায় চাকুরি করতো তখন সে সাইকেল চালাতো। এখন সে দামী মটরসাইকেলে ঘোরে।

নতুন মাদ্রাসা, পুরোনো প্রশ্ন

নতুন প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটির নির্মাণ ব্যয়, জমি ক্রয় এবং অন্যান্য খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের অনেকেরই ধারণা, এই অর্থের একটি বড় অংশ এসেছে পূর্বের মাদ্রাসা থেকেই।

অনেকেই বলেন, “আমরা তো মাদ্রাসায় দান করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, এতিম বাচ্চাদের জন্য। যদি সেই টাকা কেউ নিজের কাজে লাগায়, তাহলে সেটা শুধু অন্যায় নয়, বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।”

স্থানীয়দের দাবি, নতুন করে নির্মিত মাদ্রাসাটির অর্থের উৎস নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। সম্প্রতি বিষয়টি সামনে আসার পর এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।

অনেকেই বিষয়টিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করছেন। কেউ কেউ একে “আমানতের খেয়ানত” হিসেবেও অভিহিত করছেন।

তবে একই বিষয়ে কিছু ব্যক্তি কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এটিকে সামাজিকভাবে ক্ষতিকর একটি অনিয়ম হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তদন্তের দাবি ও প্রশাসনের ভূমিকা 

এলাকাবাসী ও সচেতন মহল ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকৃত সত্য উদঘাটন হলে বিষয়টির স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। 

তারা আরও বলেন, অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দান-অনুদানের হিসাবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিকাশ, রকেট, নগদসহ অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম এবং বিদেশি অর্থ লেনদেনের রেকর্ড যাচাই-বাছাই করা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সহজ হবে বলে তাদের ধারণা।

সামাজিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের মতে, নিয়মিত অডিট, স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা এবং জনসম্পৃক্ত তদারকি থাকলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তারা বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ আরও বাড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ এড়াতে প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি, কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন বলে তারা মত প্রকাশ করেন।

এলাকাবাসীর মতে, বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন, যাতে বিভ্রান্তি দূর হয় এবং দোষী বা নির্দোষ—উভয়ের অবস্থানই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।

সত্য উদঘাটনের অপেক্ষা

মুফতি মিলনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখনো প্রমাণের অপেক্ষায়। সবার দৃষ্টি এখন গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দিকে।  তবে ইতোমধ্যেই এটি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছে—

👉 ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এখন সবার নজর—

✔️ তদন্তের ফলাফল

✔️ আইনি পদক্ষেপ

✔️ এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দিকে।

অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, বরং একটি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়—তদন্ত কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় এবং প্রকৃত সত্য সামনে আসে কি না।

মুফতি মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিটিবি নিউজকে জানান, পড়ালেখার শেষের দিকে এবং ছাত্র থাকা অবস্থায় টিউশনি করতাম। তাছাড়া বগুড়াতে একটি প্রতিষ্ঠানে ৩ হাজার টাকা বেতনে ৩ বছর এবং নওগাঁর পয়না মহিলা মাদ্রাসাতে শুরুতে ৮  হাজার টাকা এবং শেষের দিকে ১০ হাজার টাকা বেতনে মোট ৩ বছর চাকুরি করেছি। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ইমামতিতে টাকা পেতাম। এই সকল টাকা, বাবার জমি বিক্রির টাকা, ফসলের টাকা দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ্য থাকা বাবা ও মা’কে বহুটাকা দিয়ে চিকিৎসা করানো, আমার মাদ্রাসার ১১ কাঠা জমি ক্রয় ও ১কাঠা জমি একই মালিকের কাছ থেকে দান নিয়ে মাদ্রাসা নির্মাণ এবং পর্যায়ক্রমে ২০টি গরুর খামার করেছি। আর গরুগুলো থেকে অনেক দুধও হতো। সেগুলো বিক্রি করে অনেক টাকা পেয়েছি। প্রায় সবগরুগুলোর প্রতিটি গরু ২ থেকে আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে বিক্রি করেছি। সেই সাথে শেষ দিকে সৌদি আবরের একটি সংস্থা থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা নিয়ে মাদ্রাসার বিভিন্ন ধরণের কাজ করেছি বলেও মিলন বিটিবি নিউজকে জানান। এছাড়া নিজের ও স্ত্রীর আত্নীয় স্বজন ও তাদের নিকটতমদের কাছ থেকে এবং আমার বিদেশি এক বন্ধুসহ পরিচিত কয়েকজনের কাছ থেকে কিছু টাকা উত্তোলন করেছি মাদ্রাসার কাজে লাগানোর জন্য। 

অন্য প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিন্ডার গার্টেনে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী এবং মহিলা মাদ্রাসায় ১০০ ছাত্রী আছে। তাদের মধ্যে ৪/৫ এতিম আছে। সর্বনিম্ন ৪/৫জনে ৫শত টাকা করে দেয় এবং বাকিদের নিকট থেকে পর্যায়ক্রমে সর্বচ্চো ১৫শত টাকা করে নেয়া হয়। এতে করে গড়ে প্রতিষ্ঠানে প্রায় প্রতিমাসে ১ লাখ  টাকা আদায় হয়। এতি শিক্ষকদের বেতন বাবদ ৪০-৫০ হাজার টাকা ব্যায় হয় এবং আবাসিকে খাওয়া বাবদ আরো প্রায় মাস ভেদে ৭০/৮০/৯০ হাজার আবার কখনো কখনো আরো বেশি টাকাও খরচ হয় বলে তিনি জানান। এতে করে তার ঘাটতিই বেশি থাকে বলেও তিনি জানান। আর ঐ ঘাটতি তার নিজ থেকেও কখনো কখনো মেটানো হয় বলেও তার দাবী। অথচ তার বাড়তি আয়ের কোন উৎস নেই।

মিলন আরো বলেন, সে সময় শ্বশুড় বাড়ি এলাকায় জমি কট নিয়ে জমিতে ফলস করা কালীন সময়ে প্রায় দেড়শ থেকে দু’শ মণ ধান পেতাম। জমি কট নেয়া তো হারাম। আর সেখান থেকে উৎপাদিত ফসলও তো হারাম।  তিনি একজন মুফতি হয়ে কিভাবে হারাম সম্পদ ভোগ করে এবং অন্যদের ভোগ করায় এ নিয়েও আলেম সমাজে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

জমি কটের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ আলেমদের মত, জমি বন্ধক রাখার যে পদ্ধতি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে সেটা হারাম। যেমন বন্ধকদাতা বন্ধক গ্রহীতার নিকট থেকে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা গ্রহণ করে আর বন্ধকগ্রহীতা জমি ভোগ করতে থাকে। যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন জমি হস্তান্তর করে। এটাকে কোথাও কোথাও কট রাখাও বলা হয়। এই পদ্ধতিতে সুদ রয়েছে। যেটা পুরোপুরি হারাম। আর এই সুদকে হালাল করার কোনো বৈধতা নেই। (প্রয়োজনে আরো বিস্তারিত এই লিংকটি দেখুন https://muslimbangla.com/masail/12358/undefined). মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলন একজন মুফতি হয়ে জেনে শুনে কিভাবে এই হারম পথ অবলম্বন করে। সে নিজেই যদি এই হারাম পথে অবিচল থাকে তাহলে তার শিক্ষার্থী-অভিভাবক, তার পরিচিতরা, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, তার মসজিদের মুসল্লিসহ ধর্মপ্রাণ মানুষদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে। আর তার ভক্তকুল/অনুসারী/পীর-মুরিদেরা কোন পথে যাচ্ছে! আমাদের উচিত আবেগ নয়, সচেতনতা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সত্যকে গ্রহণ করা এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা।

স্থানীয় প্রতিবেশিরা বলছে, মিলনকে জমি কট নিয়ে উৎপাদিত এতো ধান কোন দিন তার বাড়ি/মাদ্রাসায় আনতে দেখেননি। তবে তার খামারের গরুর খাবারের জন্য অনেক খড় (খ্যার/পোয়াল) কিনে আনতো।  এ নিয়েও স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয়দের ধারনা, মিলন  এ পর্যন্ত মাদ্রাসাসহ সব মিলে প্রায় ১কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছে। মাদ্রাসার আয়ের টাকায় ব্যক্তির নামে জমি ক্রয় করা অব্যাহত রেখেছে। যা  দুই প্রতিষ্ঠানে মোট ৬ বছরে চাকুরি, টিউশনি, ইমামতি আর শ্বশুর বাড়ি এলাকার ফসল দিয়ে আর কতই টাকা হয় তা পাঠকের হিসেবের উপর ছেড়ে দিলাম আপনারাই হিসেবে করুন! আর সেই সাথে তাকে কি বলে ডাকবেন? মুনাফিক, ভন্ড, প্রতারক, আত্নসাৎকারী, চোর, মিথ্যুক, হারামখোর, চতুরবাজ, ধর্মব্যবসায়ী, না মুফতি! আর যারা তাফসিরুল কুরআনের মাহফিলসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করার পথে হাঁটে তাদেরকে কি অমুসলিম বলে? সেটিও জানুন বিশেষজ্ঞ আলেম ওলামাদের নিকট থেকে, এত কিছুর পরও তথাকথিত ‘মুফতি’ মিলনের পরিণতি কী হবে—এ প্রশ্নই এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞ ও সৎ আলেমগণ বলেন, ধর্ম মানুষের আত্মিক উন্নতি, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের পথ। কিন্তু যখন এই দীনকে ব্যবসা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা শুধু ধর্মের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করে না—বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

সালাফে সালেহীনদের শিক্ষা আমাদেরকে সতর্ক করে—দ্বীনকে খাঁটি রাখতে হবে, এতে কোনো প্রকার ভণ্ডামি, দুনিয়াবি লোভ বা স্বার্থের মিশ্রণ করা যাবে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেক সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো দ্বীনের পবিত্রতা রক্ষায় সচেতন থাকা।

এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—

• সকল দ্বীনি কাজ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত কিনা তা যাচাই করা

• দ্বীনের মধ্যে কোনো বিদআত বা নতুন সংযোজন আছে কিনা তা থেকে সতর্ক থাকা

• অন্ধ অনুসরণ পরিহার করে দলীলভিত্তিক আমল করা

• ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আকিদা সালাফদের আকিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা দেখা

• তাওহীদের বিশুদ্ধ শিক্ষা ও শিরক থেকে বাঁচার ব্যাপারে তারা কতটা সচেতন তা যাচাই করা

• সুন্নাহ অনুযায়ী আমলের গুরুত্ব দেওয়া হয় কিনা তা খেয়াল রাখা

• দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, আমানতদারিতা ও জবাবদিহিতা আছে কিনা তা দেখা

• তাদের আয়ের উৎস হালাল কিনা এবং দান-অনুদান সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা

• শুধু সনদ নয়, ইলম ও আমলের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা

• কথা ও কাজের মিল আছে কিনা তা খেয়াল রাখা

• সন্তানদের জন্য নিরাপদ, পর্দাশীল ও সুন্নাহসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে কিনা তা দেখা

• নারী-পুরুষের শালীনতা ও শরীয়তের বিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা

• তারা মানুষকে তাওহীদ, সুন্নাহ ও তাকওয়ার দিকে আহ্বান করে কিনা

• বিভেদ, দলাদলি বা ব্যক্তিপূজা তৈরি করছে কিনা তা খেয়াল রাখা

• আলেমদের সম্মান করা হলেও কাউকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করে কিনা তা দেখা

• হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়ে তারা সুস্পষ্ট অবস্থান রাখে কিনা

• সমালোচনা বা প্রশ্নকে সহনশীলতার সাথে গ্রহণ করে কিনা তা যাচাই করা

একইভাবে, দান-অনুদান—হোক তা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারি-বেসরকারি তা দেওয়ার আগে অবশ্যই ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। কারণ, একটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু নিজের উপর নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপরও পড়ে।

মনে রাখতে হবে, একদিন প্রত্যেক মানুষকেই আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আমলের হিসাব দিতে হবে। সন্তানদের সঠিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া এবং দান-অনুদান সঠিক স্থানে ব্যয় করা—এটি আমাদের আমানত।

ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গা; তাই এই বিশ্বাসকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি ধর্মের নামে ভণ্ডামি, প্রতারণা ও ব্যক্তিস্বার্থের অপব্যবহার থেকে সমাজকে রক্ষা করাও অপরিহার্য। সালাফদের মূল শিক্ষা হলো—দ্বীনে ইখলাস (নিষ্ঠা), ইত্তেবা (অনুসরণ) এবং সততা বজায় রাখা। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো—দ্বীনকে বিশুদ্ধ রাখা, যাচাই-বাছাই করে চলা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সবকিছুর উপরে স্থান দেওয়া। ধর্ম কখনো ব্যবসা নয়—এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ, যা সালাফে সালেহীনরা আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন।

এই লেখার উদ্দেশ্য কারো দোষ প্রচার করা বা কাউকে হেয় করা নয়; বরং যদি কারো মাঝে কোনো ভুল বা বিচ্যুতি থেকে থাকে, তা নসীহত ও উপদেশ হিসেবে গ্রহণ করে সংশোধিত হওয়া এবং কুরআন ও সুন্নাহর সহীহ মানহাজ অনুযায়ী জীবন গড়তে সবাইকে দূর থেকে ব-হু দূ-রে এগিয়ে যেতে হবে!

মহান আল্লাহ! সবাইকে হেদায়েত করুন, সহীহ বুঝ দান করুন, আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন, আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমাদের হালাল রিজিক দিন এবং আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। মহান আল্লাহকে সর্বাবস্থায় ভয় করি, তাঁর ও রাসূলের বাণী মেনে চলি। আমাদের পরকালের মুক্তির পথ সহজ করুন। আল্লাহ হউন আমাদের সহায় -আমীন।

চলবে ....................

নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال