স্টাফ রিপোর্টার: নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনা যেন এক ভয়াবহ রহস্যের জন্ম দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুইটি নিষ্পাপ শিশু থাকায় ঘটনাটি আরও নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো অঞ্চলকে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান গরু ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও কন্যা সাদিয়া আক্তার (৩)। ঘরের ভেতর একসঙ্গে চারজনকে নির্মমভাবে হত্যা—এ যেন পরিকল্পিত নৃশংসতারই ইঙ্গিত দেয়।
যেভাবে ঘটলো হত্যাকাণ্ড
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন হাবিবুর রহমান। গভীর রাতে কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা বাড়িতে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একে একে চারজনকে গলাকেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
ভোরে ফজরের নামাজ আদায় শেষে হাবিবুরের বৃদ্ধ বাবা নমির উদ্দিন ঘরের দরজা খোলা দেখে সন্দেহ করেন। পরে ঘরে ঢুকে চারজনের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখতে পেয়ে তিনি চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। দরজা খোলা অবস্থায় পাওয়া এবং কোনো বড় ধরনের প্রতিরোধের চিহ্ন না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে—হত্যাকারীরা পরিচিত কেউ হতে পারে অথবা পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রবেশ করেছে।
২ লাখ ৮০ হাজার টাকার ছায়া
ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে—হত্যার রাতে হাবিবুর রহমান প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এই অর্থ লুটের উদ্দেশ্যই কি মূল কারণ?
তবে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু টাকার জন্য কি পুরো পরিবারকে হত্যা করা হলো, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?
জমিজমা বিরোধ: পুরনো দ্বন্দ্বের নতুন রূপ?
নিহতের পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল এবং এ নিয়ে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব অনেক সময় প্রাণঘাতী রূপ নেয়—এই ঘটনাও কি তারই বহিঃপ্রকাশ?
পুরনো ঘটনার যোগসূত্রের সন্দেহ
স্থানীয়দের মতে, প্রায় আড়াই বছর আগে পাশের গ্রামের হাইদুর মন্ডলের ছেলে নাহিদের গলায় ধারালো অস্ত্রের কোপের ঘটনা ঘটে। পরে সেই ঘটনায় হাবিবুরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যা এখনও চলমান।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, সেই ঘটনায় হাবিবুরকে মিথ্যাভাবে ফাঁসানো হয়েছিল। তারা ধারণা করছেন, আগের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে। তাছাড়া এখন প্রশ্ন উঠছে—
সেই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেই কি এই হত্যাকাণ্ড? নাকি এটি কেবলই একটি কাকতালীয় মিল?
আটক ভাগনে—নতুন মোড়
ঘটনায় নিহতের ভাগনে সবুজ হোসেনকে আটক করেছে পুলিশ। তার সম্পৃক্ততা কতটুকু, সে একা নাকি আরও কেউ জড়িত—এই প্রশ্নগুলো এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
তদন্তে একাধিক সংস্থা
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ ছাড়াও Criminal Investigation Department (CID) এবং Police Bureau of Investigation (PBI) মাঠে নেমেছে। আলামত সংগ্রহ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের আতঙ্ক ও ক্ষোভ
এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একই পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যা—এ যেন নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন। স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি—দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে এবং শিগগিরই হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।
শেষ প্রশ্ন
এই হত্যাকাণ্ড কি—
• টাকার জন্য পরিকল্পিত লুট?
• জমিজমার দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত রূপ?
• নাকি পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ?
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উত্তর মিলবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই হত্যাকাণ্ড শুধু চারটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, একটি পুরো জনপদকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।