স্টাফ রিপোর্টার: নওগাঁ মান্দার কুলিহার কাচারী পাড়া হামিয়াতুস সুন্নাহ আদর্শ বালিকা কওমি নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসাকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মাঝে। আবাসিক ওই মহিলা মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলন–এর আয়ের উৎস, প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি বরাদ্দ গ্রহণ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাহমুদুল হাসান ওরফে মিলন একটি হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও ভিক্ষা করে পড়াশোনা করেছেন বলেও এলাকাবাসী জানায়। তার বাবা দীর্ঘদিন ভ্যানচালক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন সময় মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পারিবারিক নানা দুশ্চিন্তায় একসময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। পরে সুস্থ হয়ে আবার ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে মাহমুদুল হাসান জমি কিনে একটি আবাসিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। জমি ক্রয় থেকে ভবন নির্মাণ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও তাদের ধারণা। তবে তার কোনো নির্দিষ্ট আয়ের উৎস না থাকায় এত অর্থের উৎস নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। আবার কেউ কেউ বলছে সে আন্ডার গ্রাউন্ডের সদস্য কি-না?
মাদ্রাসার আবাসিকে বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১০০ জন ছাত্রী এবং কিন্ডার গার্টেনে ৩০ শিক্ষার্থী রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাহমুদুল হাসান জানান। তিনি আরো বলেন, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসিক ফি নেওয়া হয়। ছাত্রীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন মাসিক ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে মাসিক ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। ৫শত টাকার ৩/৪জন রয়েছে। এতিম বলে দাবি করা তিন থেকে চারজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও মাসে ৫০০ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আরো বলেন, শিক্ষকদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এছাড়া আবাসিক ছাত্রীদের খাবারের জন্য মাসে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা কখনো কখনো তার চেয়েও অনেক বেশি টাকা খরচ হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে তার বড় ধরনের ঘাটতি থাকে এবং তেমন কোনো বড় দাতা নেই। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব সামান্য কিছু টাকা পয়সা দেয়। তাদের মধ্যে মাস্টারের ছেলে রুহুল আমিন নামে একজন ব্যক্তি বছরে ১০ হাজার টাকা দেন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে সেখানে কোনো এতিম নেই এবং সকল শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়। আবাসিক ছাত্রীদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মাদ্রাসার খাবারের কিছু অংশ পরিচালকের বাড়ির গরুর খামারে প্রায় ১০টি গরুকে খাওয়ানো হয় বলেও এলাকাবাসী দাবী।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির দৃশ্যমান কোনো পরিচালনা কমিটি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। দৃশ্যমান পরিচালনা কোন কমিটি নেই। পরিচালকের ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, যার কাছ থেকে জমি কেনা হয়েছে তাকে নানাভাবে ভুলিয়ে সুকৌশলে এক শতাংশ জমি দান দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বানিয়ে গোপনে বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, তথ্য গোপন করে প্রশাসনের অসৎ ব্যক্তিদের নানা কায়দায় ম্যানেজ করে গত কয়েক বছর ধরে সরকারি দপ্তর থেকে নিয়মিত বরাদ্দও নেওয়া হচ্ছে। এমনকি চার থেকে পাঁচজন এতিম দেখিয়ে ৭৫০ কেজি চাল বরাদ্দ পাশ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা নওগাঁ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি ত্রাণ কার্য চাল উপ-বরাদ্দ প্রদান তালিকা থেকে জানা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৭৫০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছে। যা গত কাল উত্তোলনের কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে।
ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মাহমুদুল হাসান সুকৌশলে ও চতুরতার সাথে নানা কায়দায় অসৎ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বিগত সময়ের ন্যায় এবারও ওই বরাদ্দ বাগিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে যেখানে বেতন নেয়া হয় সেখানে নামমাত্র চারজন এতিমের কথা বলে ৭৫০ কেজি চাল বরাদ্দ নেওয়ার গুঞ্জন উঠেছিল বেশ আগে থেকেই। অনেকেই বলছেন খুঁটির জোর কোথায়?
স্থানীয়দের আরও দাবি, এলাকায় স্বীকৃত আলেম-ওলামাদের কেউ তার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তিনি নিজেকে মুফতি ও আলেম পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে থাকেন। সর্বশেষ একটি দলের ব্যানার ব্যবহার করে দূরদূরান্তের আলেম-ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া হজ কাফেলার কোনো নিবন্ধন না থাকলেও একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নিজেকে পরিচালক দাবি করে অফিস চালানোর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে একটি অফিস খুলে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য প্রতারণার আশঙ্কার কথাও বলছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা আরও জানান, স্থানীয় এলাকার পরিচিত সুদ ব্যবসায়ী ও থানার পুলিশদের সাথে ঘোরাফেরা করা এবং থানার দালাল হিসেবে পরিচিত ইয়াকুব নামের একজন চৌকিদারও তার ব্যক্তিগত পরামর্শ ও পার্টনার।
স্থানীয় এবং অনেক আলেম ওলামাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাহমুদুল হাসান মিলন একজন চতুর, বদমেজাজী ও উগ্রপন্থী ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের ফিরিস্তি রয়েছে। সে সব সময় দাপট দেখানোর চেষ্টা করে। মাহমুদুল হাসান নিজের নানা অনিয়ম ও কুকৃত্তি আড়াল করে উপজেলার বড়বড় দু’একজন আলেমদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের নিদিষ্ট কয়েকজন মৌলভিদের সঙ্গে নিয়ে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে দাপিয়ে বেড়ায় বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে। তারসঙ্গীয় নিদিষ্ট ওই মৌলভীদের ব্যাপারেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পুরো বিষয়টি প্রশাসনের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ, স্থানীয় এলাকাবাসী ও সমাজ সচেতনমনাদের ধারনা, গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হলেই থলের বিড়াল ও প্রকৃত চিত্র বেড়িয়ে আসবে।
মান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে জিআর বরাদ্দ আসার পর বিষয়টি জানতে পাওয়ায় তাকে আর ওই বরাদ্দের চাল দেয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে, তিনি সবকিছু জানেননা বলে পিআইও’র সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলে পাশ কাটিয়ে যান।
জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তথ্যগুলো আমার কাছে পাঠান দেখছি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন তদন্ত হয়েছে কি-না তার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য পাওয়া গেলে তা ফলোআপে প্রকাশ করা হবে।