দুঃসময়ের সহযাত্রী থেকে সংসদ সদস্য
মানুষের সেবা থেকে নেতৃত্বের আসনে ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর পথচলা
মো. আব্দুল বারি খান
সম্পাদক ও প্রকাশক, বিটিবি নিউজ
নওগাঁর মান্দায় এখন একটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়—ডাঃ ইকরামুল বারী টিপু। কেউ তাকে বলেন “টিপু ভাই”, কেউ “মান্দার অভিভাবক”, আবার কারও কাছে তিনি চিকিৎসকসুলভ মানবিকতার প্রতীক। চিকিৎসা পেশা থেকে রাজনীতির মাঠ—দুই জায়গাতেই দীর্ঘ পথচলার পর তিনি এখন নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২৪তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন ডাঃ টিপু। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেল শিক্ষার্থী হয়েও তিনি ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। সেই সময় থেকেই সংগঠন, আন্দোলন ও জনসম্পৃক্ততার রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুকে আলাদা করে চিনিয়েছে তার চিকিৎসকসুলভ মানবিকতা, ত্যাগের মানসিকতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। তিনি পেশায় একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুস্বাস্থ্য, মাতৃসেবা, সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে এলাকায় একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
রাজনীতির মঞ্চে সক্রিয় হওয়ার বহু আগ থেকেই তিনি মান্দার সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন একজন নির্ভরতার নাম হিসেবে। বিভিন্ন এলাকায় ফ্রি চিকিৎসাসেবা, মেডিকেল ক্যাম্প, অসহায় রোগীদের ওষুধ সহায়তা, শিশুদের স্বাস্থ্যপরামর্শ, জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও তিনি সাধারণ মানুষের নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেক অসহায় পরিবার অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেলে তার শরণাপন্ন হয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসা সেবার এই পথচলা তার জন্য কখনোই কেবল পেশাগত দায়িত্ব ছিল না; বরং ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করা এক মানবিক প্রয়াস। একসময় তিনি ভাড়া বাসায় থেকে অস্থায়ীভাবে সকাল-সন্ধ্যা রোগী দেখতেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা দিতে তাকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত বলে জানান স্থানীয়রা। কেউ রাতের বেলায় শিশু অসুস্থ নিয়ে ছুটে এলে, আবার কেউ দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসার আশায় এলে—সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন তিনি।
মানবতার সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক সময় তিনি নামমাত্র ফি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য। অনেক পরিবার অর্থ সংকটে চিকিৎসা করাতে না পারলে তিনি ফি মওকুফ করে দিয়েছেন—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
পরবর্তীতে নিজস্ব ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করলেও মানুষের জন্য তার দরজা আগের মতোই খোলা রয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। স্থানীয়দের ভাষ্য, চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের অনেক সময় ফি ছাড়াই চিকিৎসা দিয়েছেন, কারও ওষুধের ব্যবস্থা করেছেন, আবার কাউকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার খরচও সহায়তা করেছেন।
অনেকে বলেন, “ডাঃ টিপুর চেম্বারে শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষ আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণও পায়।” স্থানীয় প্রবীণদের ভাষায়, “তিনি শুধু রোগ দেখেন না, মানুষের কষ্টও বোঝার চেষ্টা করেন।” আর এ কারণেই চিকিৎসক পরিচয়ের বাইরেও তিনি অনেক মানুষের কাছে একজন আস্থাভাজন ও মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
চিকিৎসক হিসেবে তার সামনে ছিল নিরাপদ ও সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ। সরকারি চাকরি ও পেশাগত স্থিতিশীলতার পথও তার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। মানুষের আরও কাছাকাছি থেকে কাজ করা, সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসরে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য থেকেই তিনি রাজনীতিকে বেছে নেন। অনেকের মতে, একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি মানুষের শরীরের ব্যথা দেখেছেন, আর রাজনীতিতে এসে দেখেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব সংকট।
স্থানীয়দের মতে, সাদা অ্যাপ্রোনের একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে রাজপথের সংগ্রামী কর্মী হয়ে ওঠার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়ে তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে নানা মামলা, হামলা, রাজনৈতিক চাপ, ভয়ভীতি, ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূল পরিস্থিতি। তবে এসব বাধা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং প্রতিটি প্রতিকূলতা তাকে আরও দৃঢ় ও জনমুখী করেছে বলে মনে করেন তার সমর্থকরা।
দলীয় সংকট, রাজনৈতিক দুঃসময় কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতায়ও তিনি মাঠ ছেড়ে যাননি বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি। রাজপথের কর্মসূচি থেকে শুরু করে নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া, গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো—সব ক্ষেত্রেই তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।
অনেকে বলেন, “ডাঃ টিপু শুধু সুসময়ের রাজনীতি করেননি, কঠিন সময়ের পরীক্ষাও দিয়েছেন।” স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়েও সাহস হারিয়ে না ফেলে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মানসিক শক্তি জোগানোর কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।
স্থানীয় প্রবীণদের কেউ কেউ বলেন, “ডাঃ টিপুর কাছে গেলে শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষ মানসিক ভরসাও পায়।” আবার তরুণদের ভাষায়, “তিনি নেতা হওয়ার আগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখেছেন।”
মান্দার সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, চিকিৎসকের পেশা তাকে মানুষের কষ্ট, অভাব ও বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে জনসেবামুখী রাজনীতির দিকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও চিকিৎসকসুলভ ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সেবার মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়।
রাজনীতির পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর সম্পৃক্ততার নানা উদাহরণ স্থানীয়ভাবে আলোচিত। বন্যার্ত, শীতার্ত, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত, ঝড়-দুর্যোগে বিপর্যস্ত ও অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের আলোচিত দিকগুলোর একটি বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন। বিভিন্ন দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা সংকটময় পরিস্থিতিতে খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ বিতরণ, শীতবস্ত্র প্রদান এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিয়ে তাকে মাঠে সক্রিয় দেখা গেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্যোগের সময় অনেক জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি দূরে থাকলেও ডাঃ টিপুকে সরাসরি মানুষের পাশে দেখা গেছে। কখনও বন্যাকবলিত এলাকায় নৌকায় করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, কখনও শীতার্ত মানুষের হাতে কম্বল তুলে দেওয়া, আবার কোথাও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া—এসব কর্মকাণ্ড তাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, বিএনপির দুঃসময়ে মান্দার রাজনীতিকে সক্রিয় রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মামলা-হামলা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সাংগঠনিক সংকট—সব পরিস্থিতিতে মাঠে থাকা নেতাদের একজন হিসেবে তার নাম উঠে আসে স্থানীয়দের আলোচনায়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। নির্বাচনের পর থেকেই তিনি “এমপি জনতার মুখোমুখি” নামে ব্যতিক্রমী গণসংযোগ কার্যক্রম চালু করেন। ইউনিয়নে ইউনিয়নে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা, তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেওয়া এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানের আশ্বাস—এসব কার্যক্রম তাকে অন্যভাবে পরিচিত করেছে।
স্থানীয় শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ—এসব কারণেও তিনি আলোচনায় রয়েছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবাকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরা, কৃষকদের সমস্যা ও সার-বীজ সংকট নিরসনে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, তিনি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না; বরং স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানবিক সহায়তার মতো জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও সরাসরি কাজ করার চেষ্টা করছেন। অনেকেই মনে করেন, চিকিৎসক হিসেবে মানুষের কষ্ট কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার উন্নয়ন ভাবনাকে আরও বাস্তবমুখী করেছে।
রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর মধ্যে চিকিৎসকসুলভ দায়িত্ববোধ সবসময়ই দৃশ্যমান থাকে। সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান বা ব্যস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির মাঝেও কোথাও কোনো রোগী বা অসুস্থ মানুষকে দেখলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে দ্বিধা করেন না। স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা পরিবেশের ব্যস্ততা—কোনো কিছুই তাকে চিকিৎসা থেকে বিরত রাখতে পারে না।
অনেকের মতে, মানুষের কষ্ট দেখলে তিনি পেশাগত দায়িত্বকে সবসময় অগ্রাধিকার দেন এবং সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে চিকিৎসক পরিচয়ই বেশি প্রাধান্য পায়। রোগীর পাশে দাঁড়ানোকে তিনি দায়িত্বের অংশ হিসেবেই দেখেন বলে স্থানীয়রা জানান। এ কারণে অনেকেই বলেন, ব্যস্ততার মাঝেও তিনি কখনো বিরক্তবোধ করেন না; বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে রোগীর পাশে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়াটাই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মন্তব্য করেন, “অনুষ্ঠানের মাঝেও কেউ অসুস্থ হলে ডাঃ টিপু আগে চিকিৎসক, পরে নেতা।” আর এ কারণেই মানুষের কাছে তার মানবিক পরিচয়টি রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার জনসম্পৃক্ততা ও সহজ যোগাযোগ। মাঠের রাজনীতি, চিকিৎসকসুলভ আচরণ এবং সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাকে স্থানীয় রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।
চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ থেকে সংসদের মাইক্রোফোন—ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর এই যাত্রা এখন মান্দার রাজনীতিতে একটি আলোচিত অধ্যায়। সামনে তিনি কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।