বিটিবি নিউজ ডেস্ক: বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার উদ্বেগের মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছেন প্রবাসীরা। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের জোয়ার শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনেই দেশে এসেছে ১.০৬ বিলিয়ন (১০৬ কোটি ৯০ লাখ) মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সপ্তাহভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রেমিট্যান্সের এই হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের গতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অর্থবছরের প্রথম আট মাস সাত দিনেই (জুলাই থেকে ৭ মার্চ) দেশে মোট ২ হাজার ৩৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২২.১০ শতাংশ।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হলো আসন্ন ঈদুল ফিতর। ঐতিহ্যগতভাবেই ঈদের আগে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের কেনাকাটা ও উৎসবের খরচ মেটাতে বেশি পরিমাণে অর্থ পাঠান। এবার সেই প্রবাহ আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসী আয় বাড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনাও প্রবাসীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে স্বজনদের আর্থিক চাপ কমাতে অনেক প্রবাসী আগের তুলনায় বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সের এই ‘সুবাতাস’ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ রয়েছে নীতিনির্ধারকদের কপালে। আজ সকালেই জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে রেশনিংয়ের কথা জানিয়েছেন। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় বা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্সেও।
যেহেতু আমাদের রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে, তাই ঐ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শ্রমবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সংঘাতের আঁচ রেমিট্যান্সের অংকে পড়েনি, বরং তা বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য গতি লক্ষ্য করা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগে জানুয়ারি ২০২৬ সালে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী আয় ছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স হিসেবে বিবেচিত।
উল্লেখ্য যে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছিল। চলতি অর্থবছরের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, এবার সেই রেকর্ডও অনায়াসেই ভেঙে যাবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন নানা চাপের মুখে, তখন এই এক বিলিয়ন ডলারের ইনজেকশন অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল ডলারের সংকট মেটাবে না, বরং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধে সরকারকে বড় ধরনের স্বস্তি দেবে।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আশা প্রকাশ করেছেন যে, মার্চের বাকি দিনগুলোতেও এই প্রবাহ অব্যাহত থাকবে এবং মাস শেষে এটি একটি নতুন মাসিক রেকর্ড তৈরি করতে পারে।
যুদ্ধের ডামাডোল আর জ্বালানি সংকটের উদ্বেগের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ যেন তপ্ত রোদে শীতল বৃষ্টির মতো। ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীদের এই ত্যাগ ও অবদান দেশের অর্থনীতিকে কেবল সচলই রাখছে না, বরং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।-আমার সংবাদ
-20260308112529.jpg)